LATEST POSTS

Trending News

News

POLITICS

POLITICS

Video Post

Videos

ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ও ব্রিকস সম্মেলন: প্রধানমন্ত্রীর যোগদান নিয়ে অনিশ্চয়তা

 


আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পরই একটি পৃথক দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণও দেওয়া হয়েছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমন্ত্রণপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নিজেই নেবেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি পর্যালোচনাধীন। প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনসহ একাধিক কর্মসূচি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আমন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ কিছুটা স্থবির ছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভারতের নতুন হাইকমিশনার ঢাকায় যোগ দিয়েছেন এবং উভয় পক্ষই সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। তবুও গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়ে গেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। চীন ও রাশিয়া এ বিষয়ে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরেও ব্রিকস ও এসসিও-তে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নয়াদিল্লির সম্মেলনে যোগদান বা না যোগদান—উভয় সিদ্ধান্তই কূটনৈতিক বার্তা বহন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা না আসায় বিষয়টি অনিশ্চিতই রয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত যাই হোক, তা ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী গতিপথ এবং ব্রিকসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীকে বরণে প্রস্তুত চট্টগ্রাম, নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত

 

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার চট্টগ্রাম সফরে আসছেন তারেক রহমান।

আগামী ৯ আগস্ট (রোববার) প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি থেকে বাঁশখালী উপজেলায় যাবেন। সেখান থেকে ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে অনুষ্ঠান শেষে সন্ধ্যায় নগরীতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ইতোমধ্যে এই সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী সার্বিক প্রস্তুতিও জোরদার করেছে প্রশাসন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে উজ্জীবিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা। 

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে দলীয়ভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রীকে কোথায় কীভাবে স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানানো হবে তার কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সভার কর্মসূচি রাখায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা আনন্দে উদ্বেলিত।

বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দ জানান, দলের চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবারের সফরে চট্টগ্রামের তিনটি ইউনিটের বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটির সব সদস্যকে নিয়ে সাংগঠনিক সভার আয়োজন করেছেন। এই সভায় প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সাথে সরাসরি কথা বলবেন এবং তাদের কথা শুনবেন। এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দেবেন তিনি। এই প্রথম বারের মতো এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বেশ উচ্ছ্বসিত, তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে মনের আবেগ প্রকাশ করার অপেক্ষায় আছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে চূড়ান্ত করা সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৯ আগস্ট একদিনের সফরে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম আসছেন। তিনি ওইদিন সকাল ৯টায় মহেশখালীতে পৌঁছে সেখানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। 

সেখান থেকে তিনি দুপুর ১২টায় হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন স্থানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ত্রাণ বিতরণ ও ১০০ গৃহহারা পরিবারের হাতে নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেবেন। 

এরপর দুপুর একটায় প্রধানমন্ত্রী ফটিকছড়ি যাবেন। সেখানে আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর হাটহাজারী উপজেলার আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় গিয়ে মরহুম আল্লামা শাহ আহমদ শফি’র কবর জেয়ারত করবেন। জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে সংক্ষিপ্ত বিরতির পর হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৩০টি পরিবারকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের পক্ষ থেকে ঘর নির্মাণের সহায়তা হিসেবে প্রতি পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে অনুদান দেবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে শুভেচছা উপহার হিসেবে প্রত্যেককে ১০ হাজার করে আর্থিক অনুদান তুলে দেবেন।

সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন।

রাত ৯টা ২০মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবেন।

ছবি: বাসস
ছবি: বাসস

প্রধানমন্ত্রীর সফর সূচি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী-বায়েজিদ আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আজ বাসস’কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি মুহূর্তে এই দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথা ভাবছেন। দেশের সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কিভাবে লাঘব করা যায়, কিভাবে রাষ্ট্রকে আরও বেশি জনগণের কল্যাণে সক্রিয় রাখা যায় সেই চিন্তা করছেন। এই কারণে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজনকে দ্রুত পুনর্বাসন, তাদের ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর নতুন করে নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। আমি বন্যার সময় দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সরেজমিনে গিয়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ করেছি, বন্যার পর দ্রুত তাদের ঘরবাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারের পক্ষ বাঁশখালীতে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে, অন্যান্য উপজেলাও প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

দলের সাংগঠনিক সভার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান সব সময় দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেন, তিনি মনে করেন তারাই দলের প্রাণ। এবার চট্টগ্রামের তিনটি সাংগঠনিক ইউনিটের (মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ) বিএনপি, ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীর সাথে সরাসরি কথা বলবেন তিনি। সেখানে নেতাকর্মীরাও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। এটা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, এটাকে ধারণ করেই তিনি দেশ ও দলকে এগিয়ে নিতে চান।’

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আজ বাসস’কে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমাদের দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান চট্টগ্রামের নেতাকর্মীদের সাথে সাংগঠনিক সভা করবেন বলে আমাদের জানানো হয়েছে।’ 

সভায় কারা অংশ নেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা ক্রাইটেরিয়া (যোগ্যতা) নির্ধারণ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের পদে থাকা নেতারা অংশ নেবেন।

তবে পদে নেই এমন কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দ, যারা দীর্ঘদিন দলের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদেরও সেই সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে।’

দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দীন আজ বাসস’কে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালীতে ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করবেন।

এখানে কোনো জনসভা হবে না, তবুও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে তাকে এক নজর দেখার জন্য হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত থাকবেন। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিয়েছি।’

সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন আজ বাসস’কে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসনের পুরো টিম কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

দিল্লিতে অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে বক্তব্যের অনুমতি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ



মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

গতকাল বুধবার রাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলা হয়, ‘পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন। এ ঘটনায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ।’

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানটি আয়োজনের ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যাত্রার প্রচেষ্টায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল। এর পরেও ভারতের মাটিতে এ আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করছে।


পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এমন একটি দিন, যখন বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে, সে সময় ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত তথ্য অস্বীকার করাটা পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তাঁর অপরাধের সহযোগীদের ইতিহাসের গতিপথ উল্টে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এ ধরনের ঘৃণ্য চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনো করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ‘জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছে যে আমাদের দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না এবং বাংলাদেশ কখনোই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তাঁর মাফিয়া চক্রের আর কখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থান হবে না।’


বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক, উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশ বারবার অনুরোধ করলেও এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর বিপরীতে, যেকোনো অজুহাতে তাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে গভীর আঘাত এবং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্প্রীতিপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে গতকাল সন্ধ্যায় দিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অনলাইনে যুক্ত হয়ে প্রথমে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। পরে তিনি কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন। দুই বছর ধরে দিল্লিতে অবস্থান করে তিনি বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তা দিয়ে আসছেন। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারও দিয়েছেন। এই প্রথম দিল্লির কোনো অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সরাসরি বক্তব্য দিলেন।


প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারেন, সে বিষয়ে ৩ আগস্ট ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। এ ধরনের কার্যক্রম বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন তিনি। ওই দিন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এ কথা বলেছিলেন।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতেও শেখ হাসিনার প্রসঙ্গটি তোলে বাংলাদেশ। ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ড যে অস্বস্তি কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ‘নতুন শুরুর’ পথে বাধা, সেটা ওই দিন বাংলাদেশ জোরালোভাবে তুলে ধরে।

অসহিষ্ণু সমাজ এবং ভার্চুয়াল বিচারের কাঠগড়ায় শিক্ষিকা

 মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি রিলস। নেই কোনো অশালীনতা, নেই রাজনৈতিক বক্তব্য, নেই কাউকে বিদ্রুপ করার চেষ্টা। 

তবু সেই ভিডিও একজন শিক্ষিকাকে পরিণত করেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নির্মম বিচারের আসামিতে। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের ঘটনাটি শুধু একজন ব্যক্তির নয়; এটি আমাদের ডিজিটাল সমাজের অসহিষ্ণুতা এবং সাইবার সহিংসতার এক উদ্বেগজনক প্রতিচ্ছবি।

বিদ্যালয় ছুটির পর সহকর্মীদের সঙ্গে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী-পরিশীলিত পোশাক শাড়ি পরে আজ কেন মন উদাসী হয়ে গানের সঙ্গে একটি ছোট রিলস ভিডিও ধারণ করেছিলেন জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ আয়োজনে সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে নির্বাচিত এই শিক্ষিকা। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দের বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর কিছু ব্যক্তি এবং কয়েকটি নামসর্বস্ব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সেটিকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। মুহূর্তের মধ্যেই শুরু হয় ট্রল, কটূক্তি, চরিত্রহনন এবং সামাজিকভাবে হেয় করার প্রতিযোগিতা। এমনকি ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগও সামনে এসেছে।

প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক কি তাঁর কর্মঘণ্টার বাইরে একজন সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতে পারবেন না? আমাদের সমাজে শিক্ষককে শুধু একজন পেশাজীবী হিসেবে নয়, একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়।

এই প্রত্যাশা স্বাভাবিক ও যৌক্তিক। কিন্তু আদর্শ হওয়ার অর্থ এই নয় যে একজন শিক্ষক তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, আনন্দ প্রকাশের অধিকার হারিয়ে ফেলবেন।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অনেকের কাছে এখন তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা, সত্যের চেয়ে গুজব এবং যুক্তির চেয়ে বিদ্রুপের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। কোনো কিছু ভাইরাল হলেই আমরা প্রেক্ষাপট জানার আগেই বিচারক হয়ে যাই। ব্যক্তির চরিত্র বিশ্লেষণ করি, এমনকি তাঁর পরিবার ও পোশাকেও আক্রমণ করি। 

অথচ বাস্তবতা জানার প্রয়োজনই অনুভব করি না। আর এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি নারী হলে তো কোনো কথাই নেই!

এখানেই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব গণমাধ্যমের। সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট উপস্থাপন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কিন্তু কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ক্লিক ও ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত ঘটনাকে চটকদার শিরোনামে পরিবেশন করে। এর ফলে একটি সাধারণ ঘটনা মুহূর্তেই সামাজিক বিচারে রূপ নেয়। এটি শুধু অনৈতিক নয়; এটি একজন মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করারও শামিল।


সাইবার বুলিংকে অনেকেই ‘মজা’ বা ‘সমালোচনা’ বলে উড়িয়ে দেন। বাস্তবে এর প্রভাব অনেক গভীর। ধারাবাহিক অনলাইন হয়রানি একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দিতে পারে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়াতে পারে, এমনকি বিষণ্নতার কারণও হতে পারে। একজন শিক্ষক যখন এমন পরিস্থিতির শিকার হন, তখন এর নেতিবাচক প্রভাব তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।


এই ঘটনায় একটি ইতিবাচক সাড়াও পরিলক্ষিত হয়েছে এবং হচ্ছে। সারা দেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা একই গান ব্যবহার করে নিজেদের রিলস ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। এটি শুধু একজন সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানো নয়; বরং একটি স্পষ্ট বার্তা—ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর সংগঠিত আক্রমণকে শিক্ষকসমাজ নীরবে মেনে নেবে না। তবে এই সংহতির পাশাপাশি আমাদের আত্মসমালোচনাও জরুরি। ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে আমাদের কি কোনো নৈতিক দায়িত্ব নেই? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই স্বাধীনতা কখনোই অন্যের সম্মান নষ্ট করার লাইসেন্স হতে পারে না। সমালোচনা হতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু অপমান, বিদ্বেষ এবং চরিত্রহনন কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না।


সংবাদমাধ্যমের ভাষ্য, সরকার এই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশা করা যায় তদন্তের লক্ষ্য হবে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, সাইবার হয়রানির উৎস শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে প্রয়োজন সাইবার বুলিং নিয়ে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।


প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই বাড়ছে আমাদের সামাজিক দায়িত্ব। একটি রিলস হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে, কিন্তু একজন মানুষের সম্মানহানি, মানসিক কষ্ট এবং সামাজিক অপমানের ক্ষত সহজে মুছে যায় না। বিউটি রাণী পালের ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে এসেছে, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ছি, যেখানে মানুষ নিজের স্বাভাবিক আনন্দও প্রকাশ করতে ভয় পাবে? নাকি আমরা এমন একটি ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলব, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সম্মান ও মানবিকতা অটুট থাকবে। এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন শিক্ষিকার জন্য নয়; আমাদের সবার মানবিক ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের জন্যই অতি গুরুত্বপূর্ণ।


এ ধরনের ঘটনা আমাদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষা কিংবা ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়ছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে অনলাইন আচরণেও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিফলিত হয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে উপহাসের উপকরণ না বানিয়ে তার অধিকার ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে একটি পরিণত ডিজিটাল সমাজের পরিচয়।


বাংলাদেশের পুথি সংস্কৃতি একটি রহস্যময় ঐতিহ্যের অন্তঃপাঠ


এমনকি পরবর্তীকালের সাহিত্য নিদর্শন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘শূন্যপুরাণ’, ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ধর্মমঙ্গল’, ‘মনসামঙ্গল’, ‘চৈতন্যমঙ্গল’, ‘চৈতন্যভাগবত’ থেকে শুরু করে গুপীচন্দ্রের ‘সন্ন্যাস’, ‘মক্তুল হোসেন’, ‘জঙ্গনামা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘লাইলী মজনু’, ‘ইউসুফ জোলেখা’, ‘ছয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’, ‘অন্নদামঙ্গল’, ‘গাজীকালু-চম্পাবতী’ প্রভৃতির হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপিসমূহ পুথি সাহিত্যের অমৃত ভাণ্ডার হিসেবে গৃহীত, চর্চিত ও আলোচিত হয়ে আসছে।

আগে অক্ষরজ্ঞানের বিদ্যাশিক্ষার প্রসার কম থাকায় এবং কাগজের সংকট থাকায় হস্তলিখিত পুথি বা পাণ্ডুলিপি সাধারণত একজন অভিজ্ঞ পুথি পাঠক উচ্চৈঃস্বরে নানা সুর-ছন্দে আবৃত্তি বা গান আকারে উপস্থাপন করতেন, অন্যরা দলবদ্ধ হয়ে শুনতেন। পরবর্তীকালে মুদ্রণশিল্পের বিকাশে এবং কাগজের কল প্রতিষ্ঠার ফলে হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপির পরিবর্তে মুদ্রিত পুথির প্রচলন ঘটে। মুদ্রিত পুথির প্রচলনে বহু কবির আবির্ভাব ঘটে। 

তাঁরা প্রথম পর্বে চিরায়ত পুথিকাব্যের প্রাচীন আদর্শের অনুসরণে সহজবোধ্য কাব্য, পাঁচালি প্রকাশ শুরু করেন, পরবর্তীকালে প্রাচীন আদর্শের বাইরে গিয়ে সমসাময়িক কালের নতুন নতুন বিষয় নিয়ে পুথিকাব্য রচনা ও প্রকাশনা শুরু করেন।

বাংলাদেশের পুথি সংস্কৃতির চর্চায় লিপি ও ভাষার ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করতে হয়। বাংলাদেশে প্রাপ্ত হস্তলিখিত ও মুদ্রিত পুথির মধ্যে বাংলা লিপির পাশাপাশি আরবি ও ফারসি লিপির ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা যায়। পাশাপাশি সিলেটি নাগরী লিপিতেও কিছু পুথির সন্ধান পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষার যেসব পুথি পাওয়া যায় তার বেশির ভাগেই বাংলা লিপির ব্যবহার দৃষ্ট হয়। অন্যদিকে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পুথিকাব্যের ধারায় আরবি হরফে বাংলা পুথি লিপিবদ্ধ করার ঐতিহ্য প্রত্যক্ষ করা গেছে। বাংলা একাডেমির পুথি সংগ্রহশালা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পাণ্ডুলিপি শাখার পাশাপাশি অনেকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে বেশ কিছু আরবি হরফে লিপিবদ্ধ বাংলা পুথি সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বার্মিজ লিপির কিছু প্রাচীন পুথির সন্ধান পাওয়া যায়। ভাষাজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব পুথির পাঠ এখনো সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি ভাষার পুথির সংগ্রহের মধ্যে আরেকটি বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ চিত্রিত পুথিতে। চিত্রিত পুথির মধ্যেও নানা ধরনের প্রকরণ লভ্য। একদিকে চিত্রবন্ধ কাব্য রয়েছে, অন্যদিকে আখ্যানের কাহিনি বা বিষয়বস্তু অনুযায়ী পুথি পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রাপ্ত চিত্রিত পুথির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত পাণ্ডুলিপি রাজশাহীর বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত। পুথিটির নাম ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’, এটি মূলত একাদশ-দ্বাদশ শতকের তালপাতা পুথি। বৌদ্ধ ধর্মের একটি মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে এর গুরুত্বের কথা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আট হাজার লাইনে লিপিবদ্ধ এই ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’য় প্রাচীন বাংলার পাল যুগের চিত্রকলা লভ্য। এতে ১৯১টি ফোলিও বা পাতা রয়েছে। এই পুথির চিত্রগুলো পাল আমলের শিল্পকলা, ছন্দোময় রেখা এবং রঙের চমৎকার ব্যবহার রয়েছে। কুমিল্লার রামমালা গ্রন্থাগারের পুথি সংগ্রহশালায় কিছু দুর্লভ চিত্রবন্ধ কাব্য সংরক্ষিত। এ ছাড়া চট্টগ্রামের আবদুস সাত্তার চৌধুরী পুথি সংগ্রহশালায় পবিত্র কোরআনের কিছু বর্ণিল হস্তলিখিত পুথি সংরক্ষিত রয়েছে।


প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশের হস্তলিখিত পুথি সাধারণত তালপাতা, বিভিন্ন ধরনের গাছের ছাল-বাকলে লিপিবদ্ধ হতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাঠের ফলকে পুথি লিপিবদ্ধ করার ঐতিহ্য দৃষ্ট হয়েছে। পরবর্তীকালে হস্তনির্মিত তুলোট কাগজে পুথি লিপিবদ্ধ করার ঐতিহ্য প্রচলিত হয়। একই সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালে মেশিনের তৈরি কাগজের ওপরেও পুথি লিপিবদ্ধ করার ঐতিহ্য চালু হয়। বাংলাদেশের রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরে পি নামের এক ধরনের গাছের পাতার ওপর খোদাই করা কিছু দুর্লভ পুথি সংরক্ষিত রয়েছে।


বাংলাদেশে প্রাপ্ত হস্তলিখিত ও মুদ্রিত অনেক পুথিতে একই সঙ্গে বহু ভাষার শব্দের ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা যায়। সে কারণে বহু ভাষার জ্ঞান বা পাঠ অভিজ্ঞতা না থাকলে পুথির রসাস্বাদন অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আর যদি প্রাচীন ও মধ্যযুগের হস্তলিখিত পুথির কথা বলা হয়, তাহলে তার পাঠোদ্ধার আরো কঠিন। কারণ প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুথি বা পাণ্ডুলিপিতে লিপির নানা বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করা যায়, পাশাপাশি বানানরীতিতেও নানা ধরনের

রূপ-রূপান্তর লভ্য, এমনকি প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুথিতে আধুনিক কালের মতো সব অক্ষর বা হরফের ব্যবহার ছিল না। বিশেষ করে আধুনিক কালের লিপিতে যেমন ‘শ’, ‘স’, ‘ষ’—এই তিনটি হরফের একসঙ্গে ব্যবহার দুর্লভ, অনেক ক্ষেত্রে একটি ‘স’ বা ‘ষ’ ব্যবহার করেই ‘শ’-যুক্ত শব্দের বানান প্রয়োগ করা হয়েছে, ‘স’ বা ‘ষ’-যুক্ত শব্দের বানানের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। একই রূপ ‘য়’ এবং ‘য’-এর রূপভেদ নির্ণয় করা কঠিন, অনেক সময় আবার ‘অ’, ‘উ’ বা ‘য়’ হরফের পরিবর্তে মধ্যযুগের পুথিতে ‘য’ ব্যবহৃত হয়েছে। হস্তলিখিত পুথিতে কালে কালে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যায় ‘র’ হরফের ব্যবহারে। প্রথম পর্যায়ে ‘ব’ হরফের আকৃতিতে নিচের দিকে একটি রেখা টেনে ‘র’ হরফটি লেখা হতো; পরে পেটকাটা ‘ব’-কে (বর্তমানে অহমিয়া হরফের ‘র’ আকৃতি) ‘র’ হরফ হিসেবে ব্যবহার করা হতো; তারও পরবর্তীকালে ‘ব’ হরফের ডান দিকে মাঝামাঝি অবস্থানে ছোট একটি রেখা টেনে ‘র’ লিপিবদ্ধ হতো। এক পর্যায়ে এই রূপের সঙ্গে নিচের দিকে বিন্দু দেওয়া হতো কোনো কোনো পাণ্ডুলিপিতে। পরবর্তীকালে ‘র’ হরফটি আধুনিক রূপ পায়। এই রূপ গ্রহণের জন্য ‘র’ হরফটিকে অন্তত চার শ বছর অতিক্রম করতে হয়েছে। যুক্তাক্ষরের রূপ নিয়েও প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্য-পাঁচালিসহ অন্যান্য পুথিতে নানা বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করা যায়। এ ছাড়া রেফের ব্যবহার তো আরো রহস্যময়। অনেক সময় রেফ চিহ্নের ব্যবহার আধুনিক কালের বানানের মতো ‘র’-এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু বেশির ভাগ সময় রেফ চিহ্নটি ‘র’-এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। সাধারণত নির্দিষ্ট হরফের উচ্চারণে শক্তি বা চাপ অথবা হরফটির দ্বিত্ব প্রয়োগ করার নির্দেশনারূপে পুথিতে রেফ চিহ্নের প্রয়োগ করা হয়েছে। এসব কারণে প্রাচীন ও মধ্যযুগের হস্তলিখিত পুথির পাঠোদ্ধার অনেকটা বিচিত্র লিপি তথা হরফের গোপন ও সংকেতময় রহস্যঘেরা ভুবনের ভেতর থেকে নতুন নতুন ভূখণ্ড, সাগর-মহাসাগর বা দিগন্ত আবিষ্কারের মতো দুর্ভেদ্য সাধনার কাজ, তার পরও এই আবিষ্কার একজন রসিকের জন্য প্রকৃতপক্ষেই নির্মল আনন্দময় ব্যাপার। আসলে সাংকেতিক লিপির ভেতর থেকে যখন একটি শব্দের প্রকৃত রূপ আবিষ্কার ও উচ্চারণ সম্ভব হয়; এবং শব্দের পর শব্দ বুননের মালায় গ্রথিত একটি পঙিক্তর অর্থপূর্ণ অবয়ব চোখের সামনে উন্মোচিত হয়, তখন যে আনন্দের উদ্ভাস পাঠকের চিত্তে ঝলক দিয়ে ওঠে তার কোনো তুলনা হয় কি! এ কথার প্রমাণস্বরূপ বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষিত আলাওলের ‘ছয়ফুলমুলুক-বদিয়ঃর্জামাল’ (মূল হস্তলিখিত পুথির বানানরীতি অনুসরণে এই রূপ দৃষ্ট হয়, মূলত ‘ছয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’ বোঝাতে এই রূপ ব্যবহার করা হয়েছে)-এর একটি হস্তলিখিত পুথির কয়েকটি পঙিক্তর উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে। হস্তলিখিত পুথির বানানরীতি অনুসরণে উদ্ধৃতিটি হলো : “ম্বর্খের চরিত্র এই নিন্দা করে য়তি। পদেক রচিতে পুনি নাইক সকতি\ ভাব-রসে ছন্দ-অর্থ গনমি অক্ষর। উক্তি-ছন্দ না বুজিয়া দোসএ বর্ব্বর\ কবি-সক্তি বিধাতার রত্নের ভাণ্ডার। সকলেরে সমান না দিছে করতার\ কেহ কহে কেহ বুজে কেহ অল্প বুজে। ম্বর্ক্ষের স্থানে মাত্র না বুজিয়া যুঝে\ অগ্রগামি কবি সবে কহিছে জে মত। অখনের কবি না পারএ তেন মত\  সপ্বর্ণ্য ভাণ্ডার সবে লোটীয়া নিল আগে। অনেক বিচারি কিছু পাইল্বম সেস-ভাগে\ প্রভুর ভাণ্ডার জেন রত্নাকর সিন্ধু। ভরএ অসক্ষ নদি না টুটএ বিন্দু\” এখানে লিপিকারের বানানরীতি অনুযায়ী পুথির পাঠোদ্ধার করা হয়েছে। মধ্যযুগের বাংলা পুথির লিপি সম্পর্কে জানা না থাকলে এ ধরনের পুথির পাঠোদ্ধার করা কঠিন। লক্ষণীয় বিষয়, এখানে ‘মুর্খ’ লিখতে ‘ম্বর্খ’ ও ‘ম্বর্ক্ষ’ লিপিবদ্ধ হয়েছে, এর অর্থ লিপিতে ‘উ’-কারের পরিবর্তে নিচের দিকে ‘ব’ বা ‘ম’ হরফটি বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ‘শক্তি’ লিখতে ‘সক্তি’, ‘শেষ’ লিখতে ‘সেস’, ‘ভরে’ লিখতে ‘ভরএ’, ‘অসংখ্য’ লিখতে ‘অসক্ষ’, ‘টুটে’ লিখতে ‘টুটএ’ প্রভৃতি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া নানা ব্যতিক্রম লভ্য। এই ব্যতিক্রম সত্ত্বেও রসিকরা পুথির রসাস্বাদনে সক্ষম ছিলেন, এখনো কেউ কেউ আছেন।

খাগড়াছড়ির বৌদ্ধ মন্দিরে রক্ষিত নাম-না-জানা বার্মিজ লিপির পুথি

বাংলাদেশের পুথি সাহিত্য চর্চায় প্রথমত সাধন সংস্কৃতির নানা দিক প্রতিফলিত হয়েছে; চর্যাপদের পুথিতে তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ লভ্য। দ্বিতীয়ত, সাধন সংস্কৃতির অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তে ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিচয়ের নানা দিকসহ লৌকিক জীবনের বিচিত্র অনুষঙ্গ পুথিকাব্যের অভ্যন্তরে গ্রন্থিত হয়েছে; ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘ছয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল’, ‘গাজীকালু-চম্পাবতী’ প্রভৃতি পুথিকাব্যে এ ধরনের দৃষ্টান্ত লভ্য। তৃতীয়ত, লোকায়ত ধর্মচেতনা থেকে জাত পুথি ‘চণ্ডীমঙ্গল’, ‘সত্যনারায়ণ পাঁচালী’, ‘সত্যপীরের পাঁচালী’, ‘বনবিবি জহুরনামা’ প্রভৃতি। চতুর্থত, সমসাময়িক কালের বিভিন্ন ঘটনা, ইতিহাস, আন্দোলন, প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম বিপর্যয়, লৌকিক প্রেমকাহিনি প্রভৃতি বিষয় পুথিকাব্যে স্থান পেয়েছে; এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বহু পুথিকাব্য রচিত, প্রকাশিত ও পরিবেশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের বিভিন্ন কালপর্বেও লৌকিক ও রাজনৈতিক জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে পুথি রচিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

একটি রহস্যময় ঐতিহ্যের অন্তঃপাঠপ্রাচীন ও মধ্যযুগে পুথিকাব্য পরিবেশনের বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্য ছিল। রাজদরবার থেকে শুরু করে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে পুথিকাব্য পরিবেশনের এই ঐতিহ্য বিস্তৃত ছিল। অনেক ক্ষেত্রে রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় পুথিকাব্য রচিত হয়েছে। আর রাজদরবারের অনুগ্রহে রচিত সেই পুথিকাব্যসমূহ বিস্তৃত হয়েছে প্রান্তিক মানুষের মধ্যে। এর প্রমাণ হিসেবে আলাওলের কাব্যভাণ্ডারের কথা উল্লেখ করা যায়। আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়, পুথিকাব্য পরিবেশনের একটি শাস্ত্রীয় কাঠামোও অতীতে প্রচলিত ছিল, তা হলো পুথিকাব্যসমূহ বিভিন্ন রাগ-রাগিণীতে সুর-ছন্দসহযোগে উপস্থাপিত হতো। সেই শাস্ত্রীয় ধারা কালের করাল গ্রাসে লুপ্ত হলেও পুথিপাঠের বিচিত্র সুর-ছন্দের বেশ কিছু ঐতিহ্য বিচিত্র উপায়ে বাংলাদেশে রক্ষিত হয়েছে। এই ঐতিহ্যের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মের শাস্ত্রীয় গ্রন্থ পাঠের ঐতিহ্য যেমন প্রত্যক্ষ করা যায়, তেমনি ধর্মনির্ভর লৌকিক আখ্যানের পরিবেশনরীতি হিসেবে পাঁচালি, পুথি, কাব্য প্রভৃতি পরিবেশনের ঐতিহ্যও প্রত্যক্ষ করা যায়। সাম্প্রতিক কালে স্যোশাল মিডিয়ার প্রসারে ইউটিউব, ফেসবুক প্রভৃতিতে প্রায়ই প্রবীণ ও নবীনদের পুথিকাব্য পাঠের ভিডিও প্রচারিত হতে দেখা যায়, যা দৃষ্টে বলা যায়, বাংলাদেশের পুথি সংস্কৃতির ঐতিহ্য রহস্যময় পথ পাড়ি দিয়ে বিচিত্র উপায়ে আজও চলমান।


প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভুবন ভোলানো হাসিতে মন জয় করা তাহসিনের সাক্ষাৎ

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে সেই তাহসিন, যে কিনা বড় বোন হারিয়ে হাসতে ভুলে গিয়েছিল।

আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাবা নাজমুল হককে নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সে।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব গাজী শাহরিয়ার পামির এ কথা জানান।  

ছবি : পিএমও
ছবি : পিএমও

রাজধানীর বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে গত ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৫-২৬’-এর সমাপনী আয়োজনে একটি ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হাজারো শিশুর ভিড়ে স্কুলড্রেস পরা এক কিশোরের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া দু’হাত আর চোখেমুখে উচ্ছ্বসিত হাসি স্পর্শ করে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। সেই কিশোরের নাম তাহসিন আব্দুল্লাহ।কিন্তু ছবির হাসির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক গভীর বেদনার গল্প।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুলে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় তাহসিন হারিয়েছিল তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, বড় বোন তাসনিয়াকে। একই স্কুলে পড়লেও সেদিন তারা ছিল আলাদা ভবনে। তাহসিন তখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী, আর তাসনিয়া পড়ত অষ্টম শ্রেণিতে। যুদ্ধবিমানটি আছড়ে পড়ে তাসনিয়াদের স্কুল ভবনে।

বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ছোট্ট তাহসিন দৌড়ে যায় বড় বোনকে খুঁজতে। কারও কাছ থেকে শুনেছিল স্যালাইন ও পানির প্রয়োজন। বড় বোনের জন্য ছোট্ট দুই হাতে স্যালাইন ও পানির বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তাহসিন। কিন্তু সেই অপেক্ষার আর অবসান হয়নি।

ছবি : পিএমও
ছবি : পিএমও

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই দুর্ঘটনার পর বদলে যায় তাহসিন। এক হিলিং সেশনে সে কাগজে লিখেছিল, ‘আমার কষ্ট অনেক। আমি আমার প্রিয় বোনকে হারিয়ে ফেলেছি। সে মারা গেছে। ওকে আমি অনেক অনেক মিস করি, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’

বোনকে হারানোর পর থেকে তাহসিনের মুখে আগের মতো প্রাণখোলা হাসি আর দেখা যেতো না।বর্তমানে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। পরিবারে তার নার্সারিতে পড়ুয়া আরও একটি ছোট বোন রয়েছে।

গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামের অনুষ্ঠানে যেনো দেখা মিলল অন্য এক তাহসিনের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন মাঠ প্রদক্ষিণ করছিলেন, তখন তাঁর কাছাকাছি আসার মুহূর্তে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে শিশুটি। সেই নির্মল হাসি আর উচ্ছ্বাস ক্যামেরাবন্দি হয়। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং অসংখ্য মানুষ তাহসিনের হাসির সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি মিলিয়ে নেন।

পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানতে পারেন, ছবির সেই হাসিমাখা মুখটির পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক পারিবারিক ইতিহাস। বিষয়টি জানার পর তিনি তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনকে তাহসিন ও তার পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব জানান,  সেই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাহসিনের সাক্ষাৎ হয়।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের পড়াশোনার খোঁজখবর নেন এবং বড় হয়ে কী হতে চায়, তা জানতে চান। তাহসিন জানায়, সে বড় হয়ে একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চায়। এছাড়া এমন কিছু করতে চায়, যার মাধ্যমে মানুষের উপকার  এবং যার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হবে।

প্রধানমন্ত্রী তাহসিনের এই স্বপ্নের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি  ছোট্ট তাহসিনকে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া, নিয়মিত খেলাধুলা এবং নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
আলাপচারিতায় তাহসিন জানায়, তার শখ ফুটবল খেলা। প্রধানমন্ত্রী নিজের স্বাক্ষর করা একটি বাস্কেটবল এবং ড্রোনসেট উপহার হিসেবে তুলে দেন তাহসিনের হাতে।

সাক্ষাৎ শেষে উচ্ছ্বসিত তাহসিন জানায়, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবারও দেখা করতে পেরে সে খুবই আনন্দিত। এমন একটি সুযোগ পাবে, তা সে কল্পনাও করেনি। পুরো বিষয়টিই তার কাছে ছিল একেবারে সারপ্রাইজ। সে বলে, স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প শোনানোর জন্য সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
মাইলস্টোনের যুদ্ধবিমান দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো তাহসিনের বাবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-২ মো. মেহেদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ আব্দুর রহমান সানী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত সহযোগী অধ্যাপক (অর্থোপেডিক) ডা. শাহ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব-১ জাহিদুল ইসলাম রনি এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর সদস্য সচিব মোকছেদুল মোমিন মিথুন উপস্থিত ছিলেন।

Politics

POLITICS

EVENTS

EVENTS

News

News

Opinion

Opinion

RELIGION

RELIGION

USA

USA

WORLD

WORLD

History

History
© all rights reserved
made with by templateszoo